Jump to content

তরফী সাহেববাড়ি

Play
Season 1, episode 7
7 min / Published

এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত ও বিশিষ্ট পরিবারবর্গ সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন এর বংশীয় সৈয়দগণের সাথে যােগসূত্র স্থাপন করার জন্য আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দেশে ইসলামের বাণী বহনকারী নবীর বংশ সৈয়দগণের সাথে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার জন্য উক্ত পরিবারবর্গ বিশেষ আগ্রহী হতে থাকেন। তেমনিভাবে অবিভক্ত আসামবাংলার সেরা জমিদার পৃথিম পাশার নবাব আলী আমজাদ খান নরপতি পশ্চিম হাবেলিতে বিবাহ করেন।

আসাম বাংলার শ্রেষ্ঠ পরক্রমশালী জমিদারের মধ্যে তাঁর নাম উল্লেখযােগ্য। ব্রিটিশ আমলে তাঁর স্টেটের ম্যানেজার ছিল ইংরেজ। তাঁর বাড়িতে পাহারাদার ছিল নেপালী। সব। সময় বাড়িতে ১০০টি বন্দুক থাকত এবং বন্দুকধারী বাহিনীর ছিল। তিনি যখন নরপতি পশ্চিম হাবেলিতে সৈয়দা ফাতিমা বানুর সাথে বিবাহের প্রস্তাব দেন, তখন প্রথম অবস্থায় সৈয়দগণ তাতে রাজি হননি। কারণ নবাব আলী আমজাদ খাঁ ছিলেন শিয়া মুসলমান। তিনি নরপতি বিবাহ করতে এসে এ সমস্যায় পড়ে যান। এত বড় পরাক্রমশালী জমিদার বিবাহ করতে এসেছেন, যার সাথে চল্লিশটি হাতি নিয়ে এসে প্রায় এক সপ্তাহ নরপতি অবস্থান করে সৈয়দগণকে রাজি। করিয়ে বিবাহ করে যান। এ সংবাদে বিলাত পর্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিল। আজও ইতিহাস প্রসিদ্ধ হয়ে আছে পৃথিম পাশার নবাববাড়ি। ঢাকা থেকে সিলেট যেতে লংলা রেল স্টেশনের অনতি দূরেই প্রসিদ্ধ পৃথিম পাশা নবাববাড়ি অবস্থিত। ইরানের তত্ত্বালীন শাহানশাহ রেজাশাহ পাহলভী দু’বার স্বপরিবারে এ নবাববাড়িতে বেড়াতে আসেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমউদ্দিন ইরানের শাহের সাথে এ বাড়িতে এসেছিলেন। তাছাড়া পৃথিবীর বহুস্থান থেকে পর্যটকগণ এ বাড়িতে আসতেন। নবাব আলী আমজাদ খানকে নিয়ে সিলেটে এখনাে প্রবাদ প্রচলিত আছে, যা সে এলাকার লােকমুখে শুনা যায় :

“বেটা থাকলে আলী আমজাদ আর সব পুয়া, হাওর থাকলে হাকালকি আর সব কুয়া।”

নবাব আলী আমজাদ খাঁ বহু স্কুল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অকাতরে দান করে গেছেন। মৌলভী বাজারে তারই প্রতিষ্ঠিত ‘আলী আমজাদ সরকারি গালর্স হাইস্কুল’ পৃথিম পাশা আলী আমজাদ হাইস্কুল তার মুসলিম শিক্ষা প্রসারের প্রচেষ্টার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছে ।

তরফী সাহেববাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার ৯ কি.মি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পৃথিমপাশা তরফী সাহেববাড়ি অবস্থিত । সৈয়দ ময়জুদ্দিন হােসেন এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। সৈয়দ ময়েজুদ্দিন হােসেন ছিলেন সিলেটের প্রথম রাজপরিবার তরফের অন্যতম শাখা নরপতির সৈয়দ আমিন উদ্দিন হােসেন সাহেবের কন্যা সৈয়দা ফাতেমা বানুর ভ্রাতা। পৃথিমপাশার জমিদার আলী আমজাদ খানের প্রথম পত্নী ছিলেন সৈয়দা ফাতেমা বানু। তিনি অত্যন্ত রূপসী এবং বিদুষী মহিলা ছিলেন। নবীবংশীয় এবং রাজপরিবারের ঐতিহ্য থাকার কারণেই আলী। আমজাদ খান এখানে সম্বন্ধ স্থাপনে আগ্রহী হন। এ বিবাহে কন্যা পক্ষ হতে বিরােধীতা করা হলেও আলী আমজাদ খানের তীব্র জেদের কাছে হার মানতে হয় । সৈয়দা ফাতেমা বানু। সৈয়দ ময়েজুদ্দিন হুসেনকে আলী আমজাদ খানের ভগ্নী লতিফা বানুকে বিয়ে করে। আত্মীয়তার বন্ধনকে অধিকতার দৃঢ় করেছিলেন।।নওয়াব আলী আমজাদ খান তাঁর বােন লতিফা বেগমকে নরপতি নিবাসী সৈয়দ মইজউদ্দিন হােসেনের কাছে বিয়ে দিয়ে ভগ্নীপতিকে নরপতি হতে পৃথিমপাশা নিয়ে। আসেন। তিনি পৃথিমপাশার পশ্চিমাংশে এক বৃহৎ বাড়ি নির্মাণ করেন, যা তরফী। সাহেববাড়ি নামে পরিচিত। নরপতি তরফ পরগনায় অবস্থিত বলে সৈয়দ মইজউদ্দিনও। তরফের বাসিন্দা ছিলেন। সেজন্যই এ বাড়ির বিরাট জমিদারি লাভ করেন। তার পরবর্তী বংশধরগণ বর্তমানে এ বাড়িতে বাস করছেন।

তরফী সাহেববাড়িতে প্রতি বছর মহররমের শােকানুষ্ঠান হয়ে থাকে। মূলত তারা নবাববাড়ির সাথে মিলেই এই মিছিল মার্সিয়া করে থাকে। ১০ই মহররমে বিরাট শােক মিছিল পৃথিমপাশা নবাববাড়ি থেকে যাত্রা করে গ্রামের পথ প্রদক্ষিণ করে তরফী সাহেববাড়ির সামনের পথ দিয়ে রবীর বাজারের পাশে অবস্থিত কারবালায় গিয়ে শেষ হয়। এবং মাগরিবের আগেই মুনাজাত হয়ে শােক মিছিল অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। এ অনুষ্ঠানটি মুসলিম জাতির জন্য একটি অতি উল্লেখযােগ্য ঘটনা। এই দিন কারবালার মরু প্রান্তরে ইমাম হােসেন (আ.) শহীদ হওয়া থেকেই ইসলাম নতুন জীবন লাভ করে। । এ বংশে ১৯১৮ সালে সৈয়দ বেনজীর হাসান তরফী সাহেববাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ নুরুল হাসান। বাল্যকালেই তার প্রতিভা ফুটে ওঠে। সিলেট এমসি কলেজ ম্যাগাজিনে নিয়মিত তার কবিতা ও গল্প ছাপা হতাে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএ পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে তৎকালীন মারাত্মক রােগ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। মাত্র বিশ বছর বয়সে এ বিরল সাহিত্য প্রতিভার অধিকারী সৈয়দ বেনজীর হাসান ১৯৩৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানায় অবস্থিত তরফী সাহেববাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ ময়েজ উদ্দিন হােসেন। মাতা লতিফা বানু। লতিফা বানু ছিলেন পৃথিমপাশার নওয়াব আলী আমজাদ খানের বােন।।

সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন ভারতের প্রসিদ্ধ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। তাঁর ক্লাসমেট ছিলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল লিয়াকত আলী খান এবং ফতে মােহাম্মদ খান (এটর্নী জেনারেল)। | লেখাপড়া শেষ করে সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন নিজ বাড়িতে চলে আসেন এবং পৈত্রিক জমিদারি দেখাশুনা শুরু করেন। সাথে সাথে নিজস্ব লক্ষ্মীপুর চা বাগান তদারক। করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে থাকেন।

সাংসারিক জীবনে সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন চার ছেলে ও তিন কন্যার জনক। ছেলে মেয়েরা যথাক্রমে সৈয়দ সালাহউদ্দিন হােসেন, সৈয়দ মনঞ্জুরুল হােসেন, সৈয়দ রিয়াজুল হােসেন, সৈয়দ শামসুল হােসেন। কন্যারা হলেন – সৈয়দা রেজিয়া বানু, সৈয়দা হেনা বানু স্বামী এম এম বাদশা সিরাজি তার দুই কন্যা বাবলি ও লাভলি, সৈয়দা আফতাবুন্নেছা স্বামী মকবুল হােসেন।

সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে লােকবল দিয়ে। সাহায্য করেছিলেন এবং শমসেরনগর বিমান ঘাঁটি করার ব্যাপারে তিনি মিঃ ক্র্যামপনসহ উদ্যোগ গ্রহণের সাথে জড়িত ছিলেন। তার এসব কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশ সরকার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেনকে সম্মানসূচক খেতাব প্রদান করেন। খেতাবটি QCH — “MAJOR O.B.E” Major Order of the British Emperior. fol starts উন্নয়নে পৃথিমপাশা আলী আমজাদ উচ্চ বিদ্যালয় আংশিক ভূমি দান করেন। তিনি তরফী। সাহেববাড়ির সামনে লােকাল রােড সড়কের পাশে সদাপাশা সরকারি প্রাইমারী বিদ্যালয়ে ভূমি দান করেন। উক্ত স্কুলসমূহের তিনি যথাক্রমে গভার্নিং বাড়ির সেক্রেটারি ও সভাপতি ছিলেন।

সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত চা বাগান মালিকদের মিটিংয়ে একবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানরে সাথে সাক্ষাত করেন। আয়ুব খান একবার পৃথিমপাশা | এসেছিলেন। ইরানের শাহ যখন পৃথিমপাশা শিকারে আসেন তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিম উদ্দিনও এসেছিলেন। আয়ুব খান তখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের সামরিক সচিব হিসেবে সাথে এসেছিলেন।

| সৈয়দ শামসুদ্দিন হােসেন জমিদার হলেও মানুষের প্রতি তার দরদ ছিল। তিনি একজন পরহেজগার শ্রেণীর মানুষ ছিলেন।

১৯৭২ সালে তিনি নিজ বাড়ি তরফী সাহেববাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

Episode ratings
Please log in or sign-up to rate this episode.
This episode is part of the Dr Elias series
exponentials.tv উত্পাদনশীলতা, আর্থিক, স্বাস্থ্য, ফিটনেস, মাইন্ডফুলেন্স ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে বর্তমান বিশ্বের সাফল্য এবং বৃদ্ধির গল্পগুলিকে কেন্দ্র করে
exponentials.tv
A podcast by exponentials.tv
exponentials.tv - a web 3 media outlet focusing on todays exponential success stories and the metaverse.
Episode comments

Join the conversation

You can post now and register later. If you have an account, sign in now to post with your account.

Guest
What do you think about this episode? Leave a comment!

×   Pasted as rich text.   Restore formatting

  Only 75 emoji are allowed.

×   Your link has been automatically embedded.   Display as a link instead

×   Your previous content has been restored.   Clear editor

×   You cannot paste images directly. Upload or insert images from URL.

×

Important Information

By using this website, you accept the use of cookies in accordance with our Privacy Policy.